টাইম ট্রাভেল নাকি নিখোঁজ ডায়েরি? ইতিহাসের ৫ জন মানুষ যারা কোত্থেকে এসেছিলেন কেউ জানে না!
কল্পনা করুন তো, আপনি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন আর হঠাৎ আপনার সামনে এমন একজন মানুষ এসে দাঁড়াল যার পোশাক-আশাক, কথা বলার ধরণ বা পাসপোর্ট আপনার চেনা পৃথিবীর কোনো দেশের সাথেই মেলে না! কিংবা এমন কেউ, যে ভরা হাটের মাঝে সবার চোখের সামনে কুয়াশার মতো মিলিয়ে গেল।
সায়েন্স ফিকশন সিনেমা বা টাইম ট্রাভেলের গল্পে আমরা এমনটা প্রায়ই দেখি। কিন্তু যদি বলি, আমাদের বাস্তব ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু মানুষের নাম সত্যি সত্যিই লেখা আছে, যারা কোত্থেকে এসেছিলেন কিংবা কোথায় হারিয়ে গেলেন—তার জবাব আজ পর্যন্ত কোনো আধুনিক বিজ্ঞান বা গোয়েন্দা সংস্থা দিতে পারেনি?
আজ আমরা ইতিহাসের এমন ৫ জন রহস্যময় মানুষের গল্প জানবো, যাদের জীবন যেন কোনো অমীমাংসিত নিখোঁজ ডায়েরি, কিংবা টাইম ট্রাভেলের এক জীবন্ত প্রমাণ!
১. ট্যারেডের রহস্যময় নাগরিক (The Man from Taured)
রহস্যের তালিকায় এই ঘটনাটি সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং রোমাঞ্চকর। ঘটনাটি ১৯৫৪ সালের জুলাই মাসের। জাপানের টোকিও শহরের হানেদা বিমানবন্দরে প্রতিদিনের মতোই ভিড়। যাত্রীদের পাসপোর্ট চেক করছিলেন ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা। এমন সময় ইউরোপীয় চেহারার এক ভদ্রলোক তার পাসপোর্ট জমা দেন।
পাসপোর্টটি দেখতে একদম আসল ছিল, কিন্তু সমস্যা বাঁধল দেশের নাম নিয়ে। পাসপোর্টে দেশের নাম লেখা ছিল 'ট্যারেড' (Taured)!
রহস্যের শুরু: ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা আকাশ থেকে পড়লেন। কারণ পৃথিবীতে 'ট্যারেড' নামে কোনো দেশই নেই! তারা যখন লোকটিকে পৃথিবীর মানচিত্র দেখিয়ে তার দেশ চিহ্নিত করতে বললেন, লোকটি ফ্রান্স এবং স্পেনের সীমানার মাঝে অবস্থিত 'অ্যান্ডোরা' (Andorra) নামক দেশটিকে দেখিয়ে অবাক হয়ে বলল, "এখানে অ্যান্ডোরা কেন লেখা? এখানে তো আমার দেশ ট্যারেড থাকার কথা, যা প্রায় হাজার বছর ধরে টিকে আছে!"
লোকটির কাছে ট্যারেডের মুদ্রা, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং ড্রাইভিং লাইসেন্সও ছিল। জালিয়াতির সন্দেহে পুলিশ তাকে একটি বহুতল হোটেলের উঁচুতলার কক্ষে আটকে রাখে এবং বাইরে কড়া পাহারা বসায়। কিন্তু পরদিন সকালে রুমে ঢুকে পুলিশ হতভম্ব হয়ে যায়। রুমের দরজা-জানালা ভেতর থেকে লক করা থাকা সত্ত্বেও লোকটি লটবহরসহ হাওয়া হয়ে গিয়েছিল! আজ পর্যন্ত সেই 'ট্যারেড' দেশের নাগরিকের কোনো খোঁজ মেলেনি। তিনি কি সমান্তরাল মহাবিশ্ব (Parallel Universe) থেকে এসেছিলেন?
২. গ্রিনের সবুজ শিশুরা (The Green Children of Woolpit)
এবার ফেরা যাক দ্বাদশ শতাব্দীর ইংল্যান্ডে। সফোকের 'উলপিট' (Woolpit) নামের একটি শান্ত গ্রামে হঠাৎ করেই দুটি অদ্ভুত শিশুর আবির্ভাব ঘটে। তারা ছিল সম্পর্কে ভাই-বোন। তাদের দেখে পুরো গ্রামের মানুষ তাজ্জব বনে যায়, কারণ শিশু দুটির গায়ের রঙ ছিল সম্পূর্ণ সবুজ!
- অদ্ভুত আচরণ: তারা সম্পূর্ণ অচেনা এক ভাষায় কথা বলছিল এবং সাধারণ মানুষের কোনো খাবারই ছুঁয়ে দেখছিল না। অনেকদিন শুধু কাঁচা শিমের দানা খেয়ে তারা বেঁচে ছিল।
- রহস্যময় দাবি: পরবর্তীতে ছেলেটি মারা গেলেও মেয়েটি সুস্থ হয়ে ওঠে এবং ধীরে ধীরে ইংরেজি ভাষা শেখে। গায়ের সবুজ রঙও স্বাভাবিক হতে শুরু করে। যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হলো তারা কোত্থেকে এসেছে, সে জানায় তারা 'সেন্ট মার্টিন্স ল্যান্ড' নামক একটি জায়গা থেকে এসেছে, যেখানে সূর্য কখনো ওঠে না এবং চারপাশ সবসময় গোধূলির মতো আলো-আঁধারিতে ঘেরা থাকে। এক রাখালের ভেড়ার পাল অনুসরণ করতে করতে তারা নাকি হঠাৎ একটি গুহা পার হয়ে এই আলো ঝলমলে পৃথিবীতে চলে আসে! তারা কারা ছিল, তা আজও প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে এক বড় ধাঁধা।
৩. ক্যাসপার হাউজার (Kaspar Hauser)
১৮২৮ সালের মে মাস। জার্মানির নুরেমবার্গ শহরের রাস্তায় আচমকাই ১৬-১৭ বছর বয়সী এক কিশোরকে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। তার হাতে একটি চিঠি ছিল, যা শহরের এক সেনা ক্যাপ্টেনের উদ্দেশ্যে লেখা।
ক্যাসপার নামের এই কিশোরটি ঠিকমতো হাঁটতে পারছিল না, কথা বলতে পারছিল না। শুধু বারবার বলছিল, "আমি আমার বাবার মতো একজন অশ্বারোহী সৈনিক হতে চাই।"
অন্ধকার অতীত: পরবর্তীতে ক্যাসপার যখন কথা বলা শেখে, সে তার জীবনের যে ভয়াবহ গল্প শোনায় তা শুনলে গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়। সে জানায়, জ্ঞান হওয়া ইস্তক সে ২ মিটার লম্বা, ১ মিটার চওড়া একটি অন্ধকার খাঁচায় বন্দি ছিল। সে কখনো সূর্যের আলো দেখেনি, মাটির ওপর পা রাখেনি। প্রতিদিন ঘুমানোর সময় কে বা কারা যেন তাকে রুটি আর পানি দিয়ে যেত।
কিন্তু রহস্য হলো, কে তাকে এভাবে বন্দি করে রেখেছিল? আর কেনই বা হঠাৎ নুরেমবার্গের রাস্তায় ছেড়ে দিয়ে গেল? ১৮৩৩ সালে ক্যাসপারকে এক অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তি বুকে ছুরি মেরে হত্যা করে, যার ফলে এই রহস্য চিরতরে মাটির নিচে চাপা পড়ে যায়। অনেকেই মনে করেন ক্যাসপার ছিলেন রাজপরিবারের কোনো গোপন সন্তান, যাকে সিংহাসন থেকে দূরে রাখতে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।
৪. ডি বি কুপার (D. B. Cooper)
এতক্ষণ যাদের কথা শুনলেন তারা সবাই হঠাৎ করে হাজির হয়েছিলেন। কিন্তু ডি বি কুপার হলেন এমন একজন, যিনি ইতিহাসের সবচেয়ে দুঃসাহসিক কাণ্ড ঘটিয়ে মেঘের রাজ্যে মিলিয়ে গেছেন। ১৯৭১ সালের ২৪ নভেম্বর। যুক্তরাষ্ট্রের পোর্টল্যান্ড থেকে সিয়াটলগামী একটি যাত্রীবাহী বিমান হাইজ্যাক করেন ড্যান কুপার নামের এক ব্যক্তি (যা পরে ডি বি কুপার নামে পরিচিত হয়)।
তার শান্ত শিষ্ট আচরণ এবং কালো সানগ্লাস পরা চেহারা দেখে কেউ ভাবতেও পারেনি তিনি কী করতে চলেছেন। তিনি দাবি করেন তার ব্যাগে বোমা আছে এবং ২ লক্ষ ডলার ও ৪টি প্যারাস্যুট দাবি করেন। বিমানটি সিয়াটলে ল্যান্ড করার পর যাত্রীদের নামিয়ে দিয়ে টাকা ও প্যারাস্যুট বুঝে নেন কুপার। এরপর বিমানটিকে আবার ওড়ার নির্দেশ দেন।
- আকাশে উধাও: বিমানটি যখন ১০ হাজার ফুট ওপর দিয়ে ঝোড়ো আবহাওয়ার মধ্যে উড়ে যাচ্ছিল, তখন কুপার বিমানের পেছনের দরজা খুলে টাকার ব্যাগসহ প্যারাস্যুট পিঠে বেঁধে রাতের অন্ধকারে লাফিয়ে পড়েন।
- তদন্তের ফলাফল: এফবিআই (FBI) ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল তদন্ত চালায়। কিন্তু ওয়াশিংটনের বিস্তীর্ণ বনাঞ্চলে তল্লাশি চালিয়েও কুপারের মৃতদেহ বা জীবিত কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ১৯৮০ সালে এক শিশু নদীর পাড়ে কুপারকে দেওয়া ডলারের একটি অংশ পোড়া অবস্থায় খুঁজে পায়, কিন্তু কুপার নিজে কোথায় গেলেন? তিনি কি বেঁচে আছেন, নাকি লাফ দেওয়ার পর মারা গিয়েছিলেন? এই প্রশ্নের উত্তর আজও আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ক্রাইম মিস্ট্রি।
৫. সডন পরিবারের শিশুরা (The Sodder Children)
১৯৪৫ সালের ক্রিসমাসের রাত। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার সডন পরিবারের বাড়িতে মধ্যরাতে হঠাৎ ভয়াবহ আগুন লেগে যায়। জর্জ সডন এবং তার স্ত্রী জেনি তাদের ৯টি সন্তানের মধ্যে ৪ জনকে নিয়ে কোনোমতে জ্বলন্ত বাড়ি থেকে বের হতে পারেন। কিন্তু বাকি ৫টি শিশু ভেতরেই আটকে পড়ে।
আগুন এত তীব্র ছিল যে বাড়িটি দ্রুত ভস্মীভূত হয়ে যায়। দমকল বাহিনী যখন পৌঁছায়, তখন সব শেষ। কিন্তু আসল রহস্য শুরু হয় এরপরই।
রাখালের খোঁজে ছাই: আগুনে পুড়ে মারা গেলে মানুষের হাড় বা অবশিষ্টাংশ ধ্বংসস্তূপে পাওয়ার কথা। কিন্তু ফায়ার সার্ভিসের দীর্ঘ তল্লাশির পরও ওই ৫টি শিশুর কোনো হাড়, দাঁত বা পুড়ো মাংসের কণা খুঁজে পাওয়া যায়নি! যেন তারা ওই জ্বলন্ত ঘরের ভেতর থেকেই হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।
জর্জ এবং জেনির ধারণা ছিল, তাদের বাচ্চাদের আসলে আগুন লাগার আগেই অপহরণ করা হয়েছিল এবং আগুনটা ছিল একটা নাটক। এই ঘটনার বহু বছর পর ১৯৬7 সালে সডন দম্পতি ডাকযোগে একটি ছবি পান, যা দেখতে তাদের নিখোঁজ হওয়া সন্তানদের একজনের প্রাপ্তবয়স্ক চেহারার মতো ছিল! ছবির পেছনে লেখা ছিল 'লুই সডন'। কিন্তু কে এই ছবি পাঠালো আর বাচ্চারা কোথায় গেল, তা আজ ৮০ বছর পরও এক অলৌকিক রহস্য।
শেষ কথা: টাইম ট্রাভেল নাকি অন্য কিছু?
এই ৫টি ঘটনাই আমাদের চেনা বাস্তবতাকে চ্যালেঞ্জ জানায়। ট্যারেডের সেই রহস্যময় মানুষটি কি ভুল করে অন্য কোনো টাইম-লাইনে চলে এসেছিলেন? কিংবা উলপিটের সবুজ শিশুরা কি সত্যিই মাটির নিচের কোনো অজানা জগতের বাসিন্দা ছিল?
বিজ্ঞান হয়তো আমাদের অনেক যৌক্তিক ব্যাখ্যা দেয়, কিন্তু ইতিহাসের এই ধুলো জমা ডায়েরিগুলো প্রমাণ করে যে, এই পৃথিবীতে এখনো এমন অনেক সত্য লুকিয়ে আছে যা মানুষের বুদ্ধি আর বিজ্ঞানের সীমানার বাইরে। আপনার কী মনে হয়? এরা কি আসলেই টাইম ট্রাভেলার ছিল, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো অন্ধকার সত্যি? কমেন্ট বক্সে আপনার মতামত জানাতে ভুলবেন না!





মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন