জেমস ওয়েবও যা দেখতে পায় না: কী এই ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি?
আমরা রাতে আকাশের দিকে তাকালে যা দেখি—কোটি কোটি তারা, গ্রহ, গ্যালাক্সি, আর ধূমকেতু—সব মিলিয়ে তা আসলে পুরো মহাবিশ্বের কতটুকু জানেন? মাত্র ৫ শতাংশ! হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। বাকি ৯৫ শতাংশ মহাবিশ্বই আমাদের চোখে সম্পূর্ণ অদৃশ্য। আধুনিক বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় এবং রোমাঞ্চকর অজানা বিস্ময়ের নামই হলো ডার্ক ম্যাটার (Dark Matter) এবং ডার্ক এনার্জি (Dark Energy)।
আজকে আমরা ডুব দেব মহাবিশ্বের এই অন্তহীন রহস্যের গভীরে।
ডার্ক ম্যাটার: মহাবিশ্বের অদৃশ্য আঠা
মহাবিশ্বে আমরা যা কিছু ছুঁতে পারি, দেখতে পারি বা অনুভব করতে পারি, তা সবই তৈরি পরমাণু (Atoms) দিয়ে। একে বলা হয় সাধারণ পদার্থ বা 'ব্যারিওনিক ম্যাটার'। কিন্তু বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখেছেন, মহাবিশ্বের প্রায় **২৭%** অংশ জুড়ে রয়েছে এমন এক পদার্থ, যার কোনো পরমাণু নেই, কোনো আলো নেই, এমনকি কোনো রেডিয়েশনও নেই। একেই বলা হয় ডার্ক ম্যাটার বা অদৃশ্য বস্তু।
কীভাবে জানা গেল এর অস্তিত্ব?
ডার্ক ম্যাটারকে সরাসরি দেখা যায় না, কিন্তু এর মহাকর্ষীয় বল (Gravitational Force) অনুভব করা যায়। বিজ্ঞানীরা যখন গ্যালাক্সিগুলোর ঘূর্ণন গতি মাপলেন, তখন এক অদ্ভুত কাণ্ড দেখা গেল। গ্যালাক্সিগুলো যেভাবে ঘুরছে, সাধারণ পদার্থের ভর দিয়ে সেই গতি ধরে রাখা অসম্ভব; নক্ষত্রগুলো ছিটকে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য 'আঠা' বা ভর পুরো গ্যালাক্সিকে একসাথে ধরে রেখেছে। এই অদৃশ্য ভরই হলো ডার্ক ম্যাটার।
ডার্ক এনার্জি: মহাবিশ্বকে দূরে ঠেলে দেওয়ার অদ্ভুত শক্তি
ডার্ক ম্যাটার যদি মহাবিশ্বকে একসাথে ধরে রাখার চেষ্টা করে, তবে ডার্ক এনার্জি করছে তার ঠিক উল্টোটা। এটি মহাবিশ্বের প্রায় ৬৮% অংশ জুড়ে থাকা এক রহস্যময় শক্তি।
১৯৯৮ সালে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন যে, আমাদের মহাবিশ্ব কেবল প্রসারিতই হচ্ছে না, বরং এর প্রসারণের গতি দিন দিন বাড়ছে (Accelerated Expansion)। মহাকর্ষের নিয়মানুযায়ী মহাবিশ্বের সব বস্তু একে অপরকে টানার কারণে প্রসারণের গতি কমে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দেখা গেল, এক অজানা শক্তি মহাবিশ্বের সবকিছুকে প্রচণ্ড গতিতে একে অপরের থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। এই মহাজাগতিক বিকর্ষণ শক্তির নামই দেওয়া হয়েছে ডার্ক এনার্জি।
ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জির পার্থক্য কী?
ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জির মূল পার্থক্যগুলো নিচে সহজভাবে দেওয়া হলো:
- পরিমাণগত পার্থক্য: আমাদের মহাবিশ্বের প্রায় ২৭% অংশ জুড়ে রয়েছে ডার্ক ম্যাটার। অন্যদিকে, মহাবিশ্বের সিংহভাগ অর্থাৎ প্রায় ৬৮% অংশ জুড়ে রয়েছে ডার্ক এনার্জি।
- কাজের পার্থক্য: ডার্ক ম্যাটার মহাবিশ্বকে একসাথে ধরে রাখতে সাহায্য করে। এটি নিজের মহাকর্ষীয় বল বা আকর্ষণের মাধ্যমে গ্যালাক্সিগুলোকে এক সুতোয় বেঁধে রাখে যেন নক্ষত্রগুলো ছিটকে না যায়। এর ঠিক উল্টো কাজ করে ডার্ক এনার্জি; এটি এক ধরনের মহাজাগতিক বিকর্ষণ শক্তি, যা মহাবিশ্বের সবকিছুকে প্রচণ্ড গতিতে একে অপরের থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে এবং মহাবিশ্বকে দ্রুত প্রসারিত করছে।
- প্রকৃতিগত পার্থক্য: ডার্ক ম্যাটার হলো এক ধরনের অদৃশ্য 'বস্তু' বা ভর, যার নিজস্ব মহাকর্ষ বল রয়েছে। অপরদিকে, ডার্ক এনার্জি কোনো বস্তু নয়, এটি হলো এক ধরনের অদৃশ্য 'শক্তি' বা ক্ষেত্র (Field)।
কেন এটি বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় বিস্ময়?
আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার সূত্র থেকে শুরু করে আধুনিক কোয়ান্টাম মেকানিক্স—কোনো কিছু দিয়েই ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জির প্রকৃত রূপ আজ পর্যন্ত ব্যাখ্যা করা যায়নি। লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার (LHC) বা জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের মতো সর্বাধুনিক প্রযুক্তি দিয়েও বিজ্ঞানীরা এখনো এর কণার সন্ধান পাননি।
> "আমরা আসলে এক বিশাল অদৃশ্য সাগরের মাঝে ভাসছি, যার মাত্র ৫% আমরা চিনি। বাকি ৯৫% এখনো এক পরম বিস্ময়।"
মহাবিশ্বের শেষ পরিণতি কী হবে, তা লুকিয়ে আছে এই দুটি রহস্যের সমাধানের ওপর। ডার্ক এনার্জি যদি এভাবেই মহাবিশ্বকে দূরে ঠেলতে থাকে, তবে হয়তো কোটি কোটি বছর পর আকাশের সব তারা হারিয়ে যাবে, মহাবিশ্ব হয়ে পড়বে এক শীতল, অন্ধকার শূন্যতা। আর যদি ডার্ক ম্যাটার জিতে যায়, তবে মহাবিশ্ব আবার সংকুচিত হয়ে এক বিন্দুতে ফিরে আসতে পারে।
আমরা বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের যুগে বাস করেও আসলে মহাবিশ্বের এক অন্ধকার গোলকধাঁধায় দাঁড়িয়ে আছি। আর এই অজানা রহস্যই মানুষকে প্রতিনিয়ত নতুন কিছু খোঁজার প্রেরণা জোগায়।
**#DarkMatter #DarkEnergy #SpaceMystery #Cosmology #Astrophysics #UnknownUniverse #ScienceBangla #মহাবিশ্বেররহস্য #বিজ্ঞান #ডার্কম্যাটার #ডার্কএনার্জি**
